Story : Ghorer Sotru - ঘরের শত্রু | Enemy of the House
প্লেটে যখন মুরগীর রোস্টটি নিবো তখনি বিয়ের স্টেজের পাশে হট্টগোল শুনে থমকে যাই। হট্টগোল শুনে স্টেজের দিকে তাকাতেই খেয়াল করি সেখানে কয়েকজন মুরব্বীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। আমি রোস্টটি আর প্লেটে নিলাম না উল্টো সেদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি আসলে ঘটনা কি?
কিছুক্ষণ বাদে এক লোক এসেই পাশের এক লোককে বললো,
"বিয়েটা মনে হয় আর হবে না, মেয়ের নামে যা শুনলাম তাতে এই মেয়েকে বিয়ে না করাই ভালো। মেয়ে পক্ষ কি খারাপ! এতবড় একটি ঘটনা ওনারা হাইড করলো?"
লোকটির কথা শুনে যতটুকু বুঝলাম অবস্থা বোধহয় আসলেই সিরিয়াস। আমি আর একমুহূর্ত দেরী না করে আধপেট খেয়ে হাত ধুয়েই টেবিল থেকে উঠে গেলাম।
সজীব গত তিনদিন যাবৎ আমাকে বারবার ফোন দিয়ে বলেছে,
"বন্ধু তোর কিন্তু আমার বোনের বিয়েতে আসতেই হবে, যতই ব্যস্ততা থাকুক তোর, না আসলে কিন্তু খবর আছে।"
ছেলেটির এমন জোরাজুরিতে শেষমেশ অনেকটা বাধ্য হয়েই চলে এসেছি। কিন্তু শুভ কাজের এই অন্তিম মুহূর্তে কি এমন অঘটন ঘটলো তা ঠিক বুঝতে পারছি না।
স্টেজের সামনে যেতেই আমাকে দেখে সজীব কিছুটা এগিয়ে আসলো। আমি জিজ্ঞেস করি,
"কি ব্যাপার কি হয়েছে রে?"
আমার কথা শুনে ও বেশ অসহায় দৃষ্টিতে বললো,
"বুঝতে পারছি না। আমার বোন জীবনে কোনো খারাপ কাজ করেনি এমনকি অচেনা কোনো ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে দুই মিনিট কথাও বলেনি অথচ ওনারা বলছে যে আমার বোন নাকি একমাস আগে এক ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল কিন্তু সেটা আমরা ওনাদের কাছে গোপন রেখেছি।"
সজীবের মুখে এমন কথা শুনে আমার কৌতূহলের সীমা রইলো না। আমি আর ওর সাথে তেমন কথা না বাড়িয়ে সবচেয়ে বেশি চিল্লাপাল্লা করা বরপক্ষের এক মুরব্বীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি,
"আপনি ছেলের কি হোন?"
আমাকে এগিয়ে আসতে দেখে ইতোমধ্যে আগত অতিথিরা কৌতূহল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটি উত্তেজিত কণ্ঠে বললো,
"আমি ছেলের চাচা! আপনারা সবাই ধোঁকাবাজ, ভালোয় ভালোয় আগে সব জেনে গেছি নাহলে এই নষ্টা মেয়ের সাথে আমার ভাতিজাকে বিয়ে করালে আমাদের মানসম্মান সব যেতো।"
আমি লোকটিকে কঠোর গলায় ধমক দিতেই আশেপাশের পুরো দৃশ্য মুহূর্তেই পাল্টে গেলো। পরক্ষণেই আমি স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করি,
"মেয়ের ব্যাপারে আপনাকে এসব কথা কে বলেছে?"
লোকটি পুনরায় উত্তেজিত কণ্ঠে বলে,
"যে বলার বলেছে! আপনাকে বলতে হবে নাকি? আমরা শুনেছি এটাই বড় কথা। আর যা কিছু রটে তার কিছু সত্যিও হয়।"
লোকটির কথা শুনে বুঝলাম তাকে এতো সহজে ঘায়েল করা যাবে না হয়তো। তাই পকেট থেকে আমার পুলিশের কার্ডটি বের করে বললাম,
"এই যে দেখেন! আমি পুলিশের লোক। সবকিছু যদি খুলে না বলেন এবং আপনাকে মেয়ের নামে কে এসব মিথ্যা কথা বলেছে সেটা যদি না বলেন তাহলে বুঝতেই পারছেন কি হবে? অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে এসে আপনারা সামান্য ইস্যু নিয়ে বিয়েটা ভেঙে দিবেন আর মেয়ের বাড়ির ক্ষতি করবেন সেটা হতে পারে না। একজন বললো আর অমনি লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এসেছেন যে বিয়ে হবেনা! মগের মুল্লুক নাকি?"
আমার কথা শুনে এই মুহূর্তে চারিপাশে বেশ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। লোকটির উত্তেজিত চেহারাখানিও বেশ নমনীয়তায় রূপ নিলো। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে ইতঃস্তত ভঙ্গিতে বলে,
"আসলে আমার এতো উত্তেজিত হওয়ার কোনো কারণ ছিল না আর আমি এটাকে বিশ্বাসও করতাম না যদি বাহিরের কোনো মানুষ এসব কথা বলতো।"
আমি কৌতূহল দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করি,
"তারমানে বলতে চাচ্ছেন মেয়ে পক্ষের কেউই এসব বলেছে আপনাকে?"
"হ্যাঁ"
"কে বলেছে?"
লোকটি বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে পুনরায় ইতঃস্তত ভঙ্গিতে বললো,
"মেয়ের ফুফা বলেছে আমাকে এসব কথা।"
লোকটির কথা শেষ হতেই আমি সজীবের দিকে তাকাই। খেয়াল করি, ওর শ্যামলা মুখখানিতে এক রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। ওর মনের অবস্থা আমি কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারছি।
সজীবের বোনের বিয়েটা ভাঙ্গেনি, কারণ মিথ্যা কখনো চাপা থাকে না, সেটা প্রকাশ পাবেই আজ কিংবা কাল। তবে সাথে সাথে আমরা বিষয়টা জেনে ফেলায় হয়তো তেমন কোনো অঘটন ঘটেনি।
দুজন বসে আছি টেবিলে হঠাৎই সজীব বললো,
"আমার ফুফাতো ভাই পেশায় একজন ছোটখাটো চাকুরীজীবি। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা ওর স্বভাব চরিত্র একদমই ভালো না। ফুফা চেয়েছিলেন তার ছেলের সাথে মুনাকে যেন বিয়ে দেই। কিন্তু আমাদের পরিবারের কেউই রাজি ছিল না। আর এসব কিছু মিলিয়ে ফুফা বুদ্ধি করেই আমাদের নামে একটি কলঙ্ক ছড়িয়ে দিয়ে বিয়েটা ভেঙেই দিয়েছিলেন প্রায়। তুই যদি আজ না থাকতি তাহলে হয়তো বিয়েটা ভেঙেই যেতো।"
আমি সামান্য হেসে বললাম,
"সে যাই হোক! কিন্তু পুলিশ হয়ে যে শো অফটা করলাম সেটা আসলে ঠিক হয়নি, ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে গেলো!"
"ভাই! ভালো কাজ হাসিলের জন্য ক্ষমতা দেখানোকে অপব্যবহার বলে না। তোর নৈপুণ্যে হয়তো আজ বড় বিপদের হাত থেকে বেঁচে গেছি সবাই।"
আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলি,
"মানুষ মাঝে মাঝে বলে 'ঘরের শত্রু বিভীষণ' প্রবাদটি কিন্তু আসলেই মিথ্যে নয়। বুঝলি! ঘরের শত্রুর থেকে বড় শত্রু বোধহয় এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। কোন সময় ঝোপ বুঝে কোপ মেরে দেয় তা বুঝা বড় দায়।"
সজীব চুপ হয়ে আছে, মুখে কোনো কথা নেই কিন্তু কিছু একটা ভাবছে। হয়তো আমার কথার প্রকৃত অর্থটা মন থেকে অনুধাবন করার প্রচেষ্টায় আছে, এছাড়া আর কিইবা করবে? কিইবা করার আছে ওর?
(সমাপ্ত)
#ঘরের_শত্রু
