নীরবতার মূল্য | The price of silence

 নীরবতার মূল্য

শহরের প্রান্তে একটি ছোট্ট বইয়ের দোকান ছিল। দোকানটির নাম ছিল "শব্দের ঘর"। আশ্চর্যের বিষয়, দোকানটির মালিক খুব কম কথা বলতেন। কেউ বই কিনতে এলে তিনি শুধু বইটি হাতে তুলে দিতেন, হাসতেন, তারপর আবার নিজের কাজে মন দিতেন।

লোকজন বলত,
"এই মানুষটা নিশ্চয়ই খুব অহংকারী।"

কেউ বলত,
"হয়তো কথা বলতে জানে না।"

কিন্তু সত্যিটা ছিল অন্যরকম।

তার নাম ছিল মাহির।

একসময় তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত বক্তা। হাজার হাজার মানুষ তাঁর কথা শুনতে আসত। তাঁর ভাষণ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেত।

কিন্তু একদিন একটি ভুল কথা...

মাত্র একটি বাক্য...

একটি পরিবার ভেঙে দিয়েছিল।

দুই বন্ধুর মধ্যে সৃষ্টি করেছিল আজীবনের দূরত্ব।

সেদিন থেকে মাহির নিজের কাছে একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—

"যে কথা মানুষের হৃদয় জোড়ে না, সেই কথা আমি আর বলব না।"

তারপর থেকে তিনি কম কথা বলতে শুরু করেন।

বছর কেটে যায়।

একদিন বিকেলে দোকানে ঢোকে এক তরুণ।

তার চোখ লাল।

মনে হয়, সারারাত কেঁদেছে।

সে একটি ডায়েরি কিনে কাউন্টারে এসে দাঁড়াল।

মাহির শুধু জিজ্ঞেস করলেন,

"উপহার দেবেন, নাকি নিজের জন্য?"

তরুণটি মৃদু হেসে বলল,

"নিজের জন্য।"

"লিখবেন?"

"হয়তো।"

"তাহলে একটা কথা মনে রাখবেন..."

মাহির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

"যে কষ্ট মুখে বলা যায় না, অনেক সময় তা কাগজ শুনে নেয়।"

তরুণটি মাথা নাড়ল।

সেদিন থেকেই সে প্রতিদিন ডায়েরি লিখতে শুরু করল।

সে লিখত নিজের ব্যর্থতার কথা।

নিজের ভয়।

নিজের রাগ।

নিজের স্বপ্ন।

এক বছর পরে সে আবার দোকানে এল।

এবার তার মুখে আত্মবিশ্বাস।

সে বলল,

"আপনি আমাকে চেনেন?"

মাহির হেসে বললেন,

"মানুষকে মুখ দিয়ে নয়, চোখ দিয়ে চিনতে হয়।"

তরুণটি বলল,

"আপনার ওই একটি কথাই আমার জীবন বদলে দিয়েছে।"

তারপর সে নিজের লেখা প্রথম বইটি মাহিরের হাতে তুলে দিল।

বইয়ের প্রথম পাতায় লেখা—

"যিনি আমাকে কথা বলতে শেখাননি, বরং নিজের ভেতরের কথাগুলো শুনতে শিখিয়েছেন—তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা।"

মাহির কিছু বললেন না।

শুধু বইটি বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

সন্ধ্যা নেমে এলো।

দোকান বন্ধ করার সময় তিনি পুরোনো একটি কাঠের বাক্স খুললেন।

ভেতরে শত শত চিঠি।

সবগুলোই মানুষের লেখা।

কেউ লিখেছে—

"আপনার একটি বাক্য আমাকে আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছে।"

কেউ লিখেছে—

"আপনার নীরবতা আমাকে বুঝিয়েছে, সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে হয় না।"

কেউ লিখেছে—

"আপনি না থাকলে হয়তো আমি আজও নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না।"

মাহির প্রতিটি চিঠি পড়লেন।

তারপর বাক্সটি বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকালেন।

নিজের মনে বললেন,

"শব্দ মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে।

কিন্তু নীরবতা মানুষকে বদলে দিতে পারে।"

কয়েক বছর পরে মাহির পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।

দোকানটি বন্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু দরজার ওপর ঝুলে রইল একটি ছোট্ট কাঠের ফলক।

তাতে লেখা ছিল—

"কথা বলার আগে ভেবে দেখো—তোমার শব্দ কি কারও হৃদয়কে হালকা করবে, নাকি আরও ভারী করে দেবে?"

অনেক বছর পরও মানুষ সেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছবিটি পড়ত।

কেউ বই কিনতে পারত না।

কারণ দোকান আর ছিল না।

তবু তারা খালি হাতে ফিরত না।

কারণ কখনও কখনও একটি বাক্যই একটি পুরো বইয়ের চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়।

আর মানুষ বুঝতে শিখত—

জীবনে সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ সে নয়, যে সবচেয়ে বেশি কথা বলে।

সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ সে-ই, যে জানে—

কখন কথা বলতে হয়, আর কখন নীরব থাকাই সবচেয়ে সুন্দর উত্তর।

 

Next Post Previous Post