দ্বিতীয়বার_কি_ভালোবাসা_যায়? What is love like the second time? Part-01

 

#দ্বিতীয়বার_কি_ভালোবাসা_যায়?
#ফারহানা_কবীর_মানাল

 
রাতেরবেলা ঘুমানোর সময় আমার স্ত্রী আমার হাতটা নিয়ে ও-র কপালে উপর রাখলো। প্রচন্ড বিরক্ত হলাম। সারাদিন পর একটু শান্তিতে বসে কোন কাজ করবো তার উপায় নেই। মনে মনে প্রচন্ড বিরক্ত হলেও মুখে তেমন কিছু বললাম না। একহাত ও-র কপালের উপর রাখলাম অন্য এক হাতে মোবাইল নিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে রইলাম।
--" আমার কপালে একটু হাত বুলিয়ে দিবে?"
 
মিতার কথায় ও-র দিকে তাকালাম। চোখ বন্ধ করে আমার হাতের উপর শুয়ে আছে। হাতটা কখন মাথার উপর থেকে নিচে নিয়েছে বুঝতেই পারিনি। মোবাইলটা রেখে ও-র কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। মিনিট খানেক পর আবারও হাতটা সরিয়ে নিলাম। মিতা চোখ বন্ধ করে আছে। হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। হাতটা ও-র মাথার নিচ থেকে সরিয়ে নিজের কাজে মন দিলাম। যাক বাবা! এখন আর কেউ বিরক্ত করবে না। শান্তি!
 
আমার অলক্ষ্যে মিতার চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। বালিশ সেই পানিটুকু শোষণ করে নিলো। তবে বালিশের উপর তার ছাপটা স্পষ্ট রয়ে গেছে। আমি অবশ্য সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলাম না। চুপচাপ নিজের কাজ করে গেলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মিতা আমার পাশে শুয়ে আছে। ঘড়িতে তখন সকাল আটটা বাজে। মিতা সচারাচর এতো বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে না। শরীর খারাপ হলো নাকি আবার। এই মেয়েটাকে নিয়ে যে কি করি! মাসের ভিতর পনেরো দিন অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বর হয়েছে কিনা দেখতে কপালে হাত দিয়েই চমকে উঠলাম। সারা শরীর একদম বরফের মতো ঠান্ডা। কয়েকবার ডাক দিলাম, কিন্তু মিতা কোনো সাড়া দিলো না। মিতার মুখটা এক পাশে বেঁকে রয়েছে, হয়তো স্ট্রোক করেছে, না হলে অন্যকিছু। মোট কথা মিতা আর পৃথিবীতে নেই। 
 
বাড়িতে আমি আর মিতা দু'জনেই থাকি। আগে অবশ্য মা ছিলেন। বেশ কয়েকদিন হলো মা আপুর বাড়িতে গিয়েছে। একবার মেয়ে বাড়ি গেলে দুই-তিন মাসের কম থাকে না। আপুর বাড়ি বেশ দূরে হওয়ায় তেমন একটা যাওয়া হয় না। আর গেলে বেশ কয়েকদিন থাকা পড়ে। মোবাইলটা বের করে সকলকে জানিয়ে দিলাম। একে একে বাড়িতে লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকলো। 
 
আমি মিতার নিথর দেহটা একটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছি। আমার তেমন একটা কষ্ট হচ্ছে না। চোখে তেমন পানিও নেই। চুপচাপ বসে আছি। অতীতের কিছু কথা 
মনের মাঝে উঁকি দিতে চেষ্টা করছে। 
 
ইতিমধ্যে মিতার মা বাবা, বাকি আত্মীয়-স্বজন সবাই চলে এসেছে। বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেছে। কেউ কেউ আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। সবশেষে মিতার শেষ কার্য সম্পন্ন হলো। এসব কান্নাকাটি আমার একদম ভালো লাগছে না। তাই চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেলাম। দরজা আটকে একটা ঘুম দিবো ভাবলাম। শুয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে গেছি নিজেও জানি না। 
 
ঘুম থেকে উঠার পর দেখলাম বিছানায় মিতার জায়গাটা ফাঁকা পড়ে আছে। কাল রাতের কথা মনে পড়লো, শেষবার আমাকে বলেছিলো আমার কপালে একটু হাত বুলিয়ে দিবে, আচ্ছা ও-র কি মাথা যন্ত্রণা করছিলো, অনেক খারাপ লাগছিলো, ইসস কেন যে একটু জানতে চাইলাম না। হয়তো খুব খারাপ লাগছিলো বলেই আমাকে বলেছিলো কপালে হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু ও-র খারাপ লাগলে তো আমাকে বলতে পারতো। নাকি আমার উপর অভিমান করেছিলো? 
 
নিজের অজান্তেই চোখের পাতা ভিজে যাচ্ছে। কোথাও একটা শূন্যতা অনুভব করছি। মিতার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে দুই বছর হলো। মা-ই পছন্দ করে এনেছিলো মিতাকে। স্বভাবতই মিতা খুব শান্ত। কখনো আমার কথায় অবাধ্য হয়নি, আর পাঁচটা স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মতো আমাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু কখনো সেইভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়নি। মিতা একটু আহ্লাদে প্রকৃতি, এটা ওটা বায়না করতো। আমি কখনো কখনো বেশ বিরক্ত হতাম। চোখ মুছে রান্নাঘরের দিকে রওনা দিলাম। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি। মা আপু এসেছে একটু আগে। 
 
মিতার মা ছাড়া বাবাসহ বাকিরা চলে গেছে। শুধু আপু আর মা বাড়িতে আছে, দুলাভাই কাজের জন্য আসতে পারেনি। আমাকে বেশ কয়েকবার কল দিয়েছিলো বটে। ঘর থেকে বের হতেই কানে এলো আমার মা আর শাশুড়ি মা কথা বলছে।
 
--" আপা আমার মেয়েটা তো ম/রেই গেলো, ও-র স্মৃতি হিসাবে ও-র গহনাগুলো আমাকে দিয়ে দিয়েন। "
যাঁর মেয়ে মা/রা গেছে সে কি করে গহনার চিন্তা করতে পারে আমার বুঝে আসলো না। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, মিতা তো তোমারও স্ত্রী ছিলো তাহলে তুমি কি ও-র শোকে বিভর হয়ে আছো? নিজের ভিতর থেকে কোনো উত্তর পেলাম না।
--" আপা আমার ছেলেটাকে তো আবার বিয়ে দিতে হবে। ওসব কিছু না হয় তার জন্যই থাকুক। সে-ও তো আপনার মেয়েরই মতো। "
 
মা'য়ের কথায় শাশুড়ি মা কোনো উত্তর দিলো না। চোখের কোণে লেগে থাকা অশ্রু কণাগুলো মুছে উদাস হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমি মায়ের কাছে গিয়ে বললাম, " মা আমার ক্ষুধা লেগেছে, কিছু খেতে দিতে পারো?"
 
মা উঠে আমার জন্য খাবার আনতে গেলেন। পথের ক্লান্তিতে মা একদম নুইয়ে পড়ছে। কোনো রকম ভাবে সামান্য কিছু খেয়ে নিলাম। চাইলেও খেতে পারছি না। কোনো এক অজানা কষ্ট আমাকে চেপে ধরে আছে। ক্রমশ সেই কষ্ট বেড়েই চলেছে, মিতার নিথর দেহ সামনে নিয়ে চোখের পানি পড়েনি, এখন সবকিছু মিটে যাওয়ার পর কিসের এতো কষ্ট আমার!
 
মিতা গত হয়েছে, প্রায় মাস খানেক হতে চললো। মিতা উপস্থিতির থেকে অনুপস্থিতিটা আমাকে বুঝিয়েছে মিতা আমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। না চাইতেও কতটা ভালোবাসতাম ও-কে। সত্যিই কি ভালোবাসি বলার প্রয়োজনীয়তা আছে? সত্যি কি সব কথা প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা রাখে? হয়তো রাখে, নয়তো দিন শেষে আমার মতো আপসোস নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। তুমি যাকে ভালোবাসো নিরদ্বিধায় বলে দাও, আমি তোমাকে ভালোবাসি। হয়তো উত্তর হ্যাঁ হবে নয়তো না। তবে তোমার তো আর আফসোস রইলো না।
মিতা চলে যাওয়ার পর ও-র প্রতিটা কাজ আমাকে ও-র শূন্যতা মনে করিয়ে দিয়েছে। অফিস থেকে বাড়িতে ফিরে এক গ্লাস পানি হাতে ও-র মুচকি হাসিটা আজ বড্ড মনে পড়ে। কখনো কখনো ও-র রেখে যাওয়া জিনিসগুলো নেড়েচেড়ে দেখি। নিজের অজান্তেই চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। এতো সেদিনও ও-কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। নানান টেস্ট করার পর বললো ও-র শরীরে কোনো রোগ নেই, তাহলে কেন হঠাৎ এইভাবে চলে গেলো আমাকে ছেড়ে? উত্তরগুলো যেন কোনো এক অচেনা জায়গায় হাহাকার করছে, আমি পর্যন্ত পৌঁছানোর সামর্থ্য তাদের হয়নি। 
 
এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে। মিতা গত হওয়ার ছয়মাস পর মা আমার কাছে এসে বললেন, " নাজিম বাবা। অনেকদিন তো হলো, এবার নতুন কিছু ভেবে দেখা উচিত। আমি বুড়ো হয়ে গেছি। সব কাজ পারি না। অন্তত আমার কথা চিন্তা করে একবার হলেও ভেবে দেখ। "
 
--" না মা, আমার কিছু ভালো লাগে না। তুমি জোর করো না আমাকে। "
সেদিন মা'কে এমন উত্তর দিলেও পরবর্তীতে মা আপু এমনকি মিতার মা বাবা পর্যন্ত আমাকে বুঝিয়েছে। শেষমেশ বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলাম। মা আপু এরাই মেয়ে দেখেছে। আমি মেয়েকে দেখতে যায়নি। মেয়েটা অবিবাহিত, মা বলেছে মেয়ের পরিবার নাকি সবকিছু জেনেই রাজি হয়েছে।
আমার বিয়ের দিন বুঝলাম, পৃথিবীতে কারো স্হান কখনো শূন্য থাকে না। কি সব শূন্যতা কি আদো পূর্ণ হয়? বিয়ের আগে মেয়ে সাথে কথা বলতে চাইলাম কিন্তু কেউ তেমন গুরুত্ব দিলো না।
একটু পরেই আমার বিয়ে, মিতার কবরের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। 
 
--" তোমার জায়গায় অন্যকেউ আসতে চলেছে জানো? আচ্ছা তুমি কি আমাকে ভালোবাসতে? যদি বাসতেই তবে কেন কখনো মুখ ফুটে বললে না? দুইটা বছর কি কম সময় প্রেয়সী? জানো তোমার শূন্যতা আমাকে বুঝিয়েছে ভালোবাসা কি। কেমন করে হারানোর কষ্ট উপভোগ করতে হয়। আমি না তোমার আজও ভালোবাসি। বড্ড ভালোবাসি। হ্যাসকর লাগলো তাই না? যদি তোমাকেই ভালোবাসতাম তাহলে কেন দ্বিতীয় বিয়ে করছি, কি করবো বলো, সবার কথা তো ফেলতে পারিনি। "
 
কথাগুলো বলে চোখের পানি মুছে নিলাম। স্ত্রী মা/রা যাবার সাত মাস পরে আবারও বিয়ে করা পুরুষের মুখে হয়তো ভালোবাসি কথাটা মানানসই নয়। তবুও আমি মিতাকে ভালোবাসি। ওপাশ থেকে কখনো কোনো উত্তর আসবে না জানি। মায়ের ডাকে স্থান ত্যাগ করলাম। 
 
বিয়ে করে নতুন বউকে বাড়িতে নিয়ে এসেছি। এ পলক দেখেছিলাম। দেখতে সুন্দরী বটে,তবে আমার কেন জানি দ্বিতীয়বার দেখতে ইচ্ছে করেনি। মিতার সাথে বিয়ের দিনের কথা মনে করছিলাম। সেদিনের মতো অতো আয়োজন নেই এবারের বিয়েতে। তবে বিয়ে তো বিয়েই, 
মিতার মা বাবাও আজ এসেছেন।
বাসরঘরে ফুলে সাজানো খাটের উপর এক সুন্দরী রমণী বসে আছে। সারা শরীর বিয়ের পোশাকে আবৃত। নাজিম তখনও মিতার কবরের কাছে দাঁড়িয়ে কিসব বলে চলেছে। জানালা দিয়ে বিষয়টা লক্ষ্য করলেন মর্জিনা বেগম। ছেলেটা কি বউয়ের শোকে পাগল হয়ে গেলো?
--" আসসালামু আলাইকুম। আসতে পারি?"
লজ্জায় নুয়িয়ে পড়ছে সদ্য বিবাহিত রমনী। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, ওয়ালাইকুম আসসালাম। জ্বি আসতে পারেন। "
 
নাজিম আর কোনো কথা বললো না। চুপচাপ বিছানায় কিনারায় বসে পড়লো। মেয়েটা নাজিমের ডান হাতখানা ধরে তাতে চুম্বন করল। নাজিম অবাক হলো এমন ব্যবহারে, আঁড়চোখে তাকালো মেয়েটির দিকে। 
 
--" আপনাকে প্রথম দেখেই ভালবেসে ফেলেছি। এমন সুদর্শন পুরুষ আমি এর আগে দেখিনি। বলিষ্ঠ দেহ। সুঠাম বাহু, একদম গল্পের নায়কদের মতো। তাই আপনি বিবাহিত জানার পরেও আর অমত করিনি। "
ঈষৎ হাসলো নাজিম। তারপর বিষন্ন গলায় বললো, " ভালোবাসা কি এতোটাই সহজ? আপনি খুব সহজে বলে দিলেন আমাকে ভালোবাসেন, অথচ দেখেন দুইবছর এক ছাদের নিচে থাকার পরও আমাকে সে ভালোবাসি বলতে পারেনি।"
 
কথাগুলো বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললো নাজিম। মেয়েটা আশাহত হলো। এমন উত্তর সে আশা করেনি। চুপচাপ বালিশে মাথা গুঁজে শুয়ে পড়লো। 
 
--" আপনাকে স্ত্রী অধিকার আমি নিশ্চয়ই দিবো। তবে আমাকে কিছুদিন সময় দিতে হবে। আর আমি আমার প্রথম স্ত্রীকেই ভালোবাসি। আমার কাছে এই শব্দগুলো শোনার দাবী করবেন না। "
মেয়েটা মুখে কোনো উত্তর দিলো না। মনে মনে বললো," বউ ম/রার সাত মাস পরে বিয়ে করে নাটক করছে। ভেবেছিলাম চেহারা সুন্দর মানে মানুষটাও সুন্দর। "
 
নাজিম জানালা দিয়ে দূরে করবের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশে পূর্নিমার চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। সকলের চোখ আকাশের দিকে হয়তো, তবে এক অন্ধকার কবরের দিকে নাজিম নামক যুবকের চোখ আটকে আছে, কিসব আকাশ পাতাল ভেবে চলেছে যেন।
চলবে
সূচনা পর্ব
চলবে --------------------

Next Post Previous Post