Gold অণুগল্পঃ একটি মেয়ের আত্মজীবনী | Narrative: A Girl's Autobiography


বাবার বাড়ি থেকে আজ বাবা আর মা আসবে আমায় দেখতে। ৭মাস হলো বাবার বাড়ির দরজায় পা দেওয়া হয়না শ্বশুরমশাই অসুস্থ বলে। শাশুড়ি বয়স্ক মানুষ এক সংসারের কাজ সামলাতে পারেন না। গৃহস্থ বাড়ির কাজগুলোর হিসেব নেই। সারাবছর একটা না একটা ফসলের চাষ হতেই থাকে, আর বাড়ি থেকে কাজ ফুরায় না। কাজের লোক নেওয়া থাকলেও রান্নাঘরের দিকটা আমারই সামলানো লাগে। শাশুড়ি-মা শ্বশুর মশাইকে সামলাতেই হিমশিম খান। 
 
শ্বশুর মশাই একা উঠে টয়লেটেও যেতে পারেন না। দুজন মানুষ ধরে নিতে হয় এমন অবস্থা হয়েছিলো উনার। তবে ইদানীং কালে উনি একাই একটু হাটাহাটি করতে পারেন। নিজের চলাফেরা, কাজটুকু করেন। বিয়ের বয়স তিন বছরের মাথায় গিয়ে ঠেকেছে। আগে বাবার বাসায় গেলে শাশুড়িমা রান্নাঘর দেখতেন, আমি গিয়ে একসপ্তাহ থেকে আসতাম। আমি আসলে দুজনে মিলে রান্না করি। আমি না থাকলে কাজে সাহায্য করার জন্য একটা মেয়ে আসে, সে এসে হাতে হাতে কাজ করে দিয়ে যায়। আমার ছয় ননদ, দুই ভাসুরের পর আমার স্বামী হয়েছে, যার দরুন আমায় সময়ে এসে উনাদের বয়স্ক মানুষ হিসেবে পেয়েছি। সবাই সবার সংসার নিয়ে ব্যস্ত, বয়স্ক বাবা মা কে দেখার সময় যেনো কারোর নেই। দিন সময় সব ব্যস্ততায় এভাবেই ভালো যাচ্ছে। 
 
মাঝখানে কয়েক বার বাবার বাসায় যেতে চাইলেও শাশুড়ি মা যেতে দেননি, একা এত সামলাতে পারবেন না বলে। ১৫বিঘার মতো জমির আবাদ ফসলের কাজগুলো কাজের লোক করলেও সবদিক দেখে সামলে রাখার কাজ টা উনি করেন। আমার স্বামী বাজারে মাছের আরদ থাকায় সেখানেই পরে থাকেন সারাদিন, শুধু খাওয়ার সময় এসে খেয়ে যান। আমায় বাইরের মানুষের সামনে যেতে দেন না শাশুড়ি মা ।যারা কাজ করে দেয়, তাদের দুবেলা ভাত খাওয়াতে হয়। সেই রান্না করে সব দেখা মুশকিল অনেক টা। সেই ভেবে আমি জিদ করিনি আর। বাবা মা ও আসেননি আর এই ৭টা মাসে। 
 
আসেন-নি বলতে আসতে লজ্জা পান। লজ্জা পাওয়ার কারণ আমার বিয়ে-টা হয়েছিলো করোনা শুরুর সময়ে, সবে দশম শ্রেণীতে উঠেছি। আমার বাবা সাধারণ রিকশা চালক,মা গৃহিণী।সাথে অন্যের কাথা সেলাই করে দেন। ছোটো একটা ভাই আছে। দিব্যি যখন জীবন যায়, করোনায় বাবার রোজগার নেই, গ্রামে অন্যের বাড়িতে কামলা দিয়েও দিন যেনো যেতেই হিমশিম খায়।সেই সময় টায় আমার সেজো ননদের শ্বশুর বাড়ি আমাদের গ্রামে হওয়ায় কোথায় দেখেছেন, জানিনা। 
 
পছন্দ করে তার বাবার বাড়ি খবর পাঠান। এরপর আমার বড় ননদের স্বামী আর আমার স্বামী গিয়ে দেখে পছন্দ করে বিয়ের দিন ঠিক করে চলে আসেন। এরপর ১০জন মানুষ গিয়ে বিয়ে পরিয়ে আনেন।আমার বিয়েতে মত ছিলো কি ছিলো না, আমার বাবা জানতে চাননি। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা যেনো কন্যা বিদায় করতে পারলেই চিন্তামুক্ত হোন। আমার বড় ননদের স্বামীর সাথে বাবার একটা মোটা অঙ্কের টাকার দেনাপাওনার কথা হয়। 
 
একলাখ টাকা সাথে আমার নিজের জন্য ৫আনি স্বর্ণের কানের দুল বানিয়ে দিবেন(স্বর্ণের হিসাব জানিনা,আনি গ্রামের প্রচলিত কথা,সেজন্য এটাই লিখলাম)। সেটা বাবা এখনও দেননি। যদিও বা এটা নিয়ে আমার স্বামী বা বাকি কারোর ততটা মাথা ব্যাথা নেই। কেউ কিছু বলেনও না।আগের সময়ের মানুষ, সেই সময়ের চিন্তাধারায় দেনাপাওনার কথা বলেছিলেন। উনাদের কথা দিতে মন চাইলে বাবা দিবেন, না পারলে দেওয়ার দরকারও নেই। কিন্তু বাবা দিতে চেয়ে দিতে পারেননি , সেই জায়গা থেকে একটু লজ্জাবোধ থেকে আসতে চান না আমার বাড়িতে।
 
গ্রামের দিকগুলোয় এই ব্যাপার গুলো খুব ঘটে তো।
রান্না করতে করতে যখন এসব ভাবায় ব্যস্ত, তখন উঠোনের মূল ফটক পেরিয়ে বাবা পদার্পণ করলেন। তার পিছনে আম্মা।অভিমানে কেমন যেনো চোখের কোণে জল জমলো। এতদিনে মেয়ের কথা মনে পরলো উনাদের। উঠোনের পশ্চিম পাশ টায় রান্নাঘর। উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরতাম আগে আসলে, আজ কেনো জানি মন টানলো না। অভিমান জমে বরফের পাহাড় বেঁধেছে। 
 
দেখি আজ নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন কিনা। সংসারে বেশি হয়েছিলাম বলে হয়তো বিয়ের বয়স পুরো না হতেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন নয়তো বা আমার নিয়তির লিখন। বাবা মা এসে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি সাথে কথা বলে বাড়ির বাকিদের সাথে কথা বলে আমার কাছে এসে ভালোমন্দ জিগাসা করেন। নির্জীব হেসে উত্তর দেই।শাশুড়িমা এসে চুলার ধারে বসে আমায় নাস্তা সাজাতে বলেন। 
 
কথামতো উঠে গিয়ে নাস্তা সাজাতে লাগলাম।তখনই আমার ফুফু শাশুড়ি আসলেন উনার ভাইকে দেখতে। সাথে ফুফা শ্বশুর। উনাদের পিছুপিছু আমার আরেক ফুফুর শাশুড়ির মেয়েরা আসলেন। বাড়িতে একটা আনন্দঘন মুহুর্ত তৈরি হয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। রান্নাবারির ধুম বেড়ে গেলো। টেবিল ভরা নাস্তা সাজিয়ে সবার জন্য ডেকে বসালাম।খেতে শুরু করতে বলে আবারও চুলার কাছে গিয়ে শাশুড়িকে তুলে দিয়ে উনাদের কাছে যেতে বলে বসলাম।দুপুরের খাবারের আয়োজন শেষ করে গোসল করে আবার খাবার টেবিল সাজিয়ে বাবা মায়ের সাথে কথা বলার সুযোগ হলো না।
 
বাবা মা আমার ঘরে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন। মা কাথা সেলাইয়ের টাকা জমিয়ে একটা ছাগলের ছানা কিনেছেন,ছোটো ভাই-টা সেটা দেখে রাখতেই আসেনি বাবা মায়ের সাথে। সবাইকে খেতে দিয়ে খাবার দাবারের তদারকি শেষে শাশুড়ি সাথে খেতে বসতে বললেন।কেনো জানি ভাই-টার কথা মনে পরে খাবার আর গলা দিয়ে নামতে চাইলো না।ভাই আমার খাসির গোস্তো খুব পছন্দ করে,চিংড়ি মাছের ভুনাও পছন্দ করে।ঈদ ব্যতিত আমাদের এগুলোর কিছুই খাওয়া হতো না।
 
বাবা ঈদের আগে আগে টাকা জমাতেন একটু একটু করে।ঈদের দিনগুলোয় আমাদের দুই ভাইবোনের পছন্দ মতো বাজার করতেন।সেই দিনগুলোই হয়তো সুন্দর ছিলো ।টেবিলে বাটি ভর্তি করে সাজিয়ে রাখা। দুটো তুলে ভাইয়ের জন্য সাজিয়ে দিবো সেই সাহস হয়না। 
 
কি না কি ভাবেন সব সেই ভয়ে। বাবা মা বিকেল হতেই চলে যাওয়ার কথা বললেন। শাশুড়ি থাকতে বললেও বাবা আমার দিনমজুর,একদিন বসে থাকলেই পেটে ভাত যাবেনা।সেজন্য বাধা দিলাম না থাকার কথা বলে। চলে যাওয়ার সময় বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে হাতে ৫০টাকা গুজে দিয়ে বললেন,
" কিছু আনিয়ে নিয়ে খেয়ো আম্মা। 
 
আজ তো বাড়িতে মানুষ। তোমার শাশুড়ির সাথে কথা বলেছি।ধানের কাজ শেষ হলেই যেতে দিবে বলেছেন।আমি এসে নিয়ে যাবো তোমায়। নিজের খেয়াল রেখো আম্মা। "
 
কথাটা বলেই বাবা চলে গেলেন। তার সাথে আম্মাও। আমি দরজায় দাড়িয়ে শুধু দেখলাম বাবা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে হয়তো চোখ মুছলেন। আবার আমার অপেক্ষার প্রহর শুরু কবে বাবার বাসায় যেতে পারবো। আমিও চোখের কোণে জমা জলটুকু মুছে ঠোঁটে নির্জীব হাসি টেনে শাশুড়ি ডাকায় চলে গেলাম সেদিকে। 
 
সমাপ্ত
 
অণুগল্পঃ একটি_মেয়ের_আত্মজীবনী

Next Post Previous Post