সূরা আর রহমান (الرحمن) - মন জুড়ানো তেলাওয়াত | Zain Abu Kautsar | গল্প অভিশপ্ত জীবন | Story Cursed Life

#গল্প অভিশপ্ত জীবন
#Rozina_Rose
 
ফোন এলো আমার স্বামী রোমান এক্সিডেন্ট করেছে, তার দশ মিনিট পেরুতেই জানতে পারলাম হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছে। আমি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছি, মনে হচ্ছে আমি যেন কাঁদতে ভুলে গেছি! হঠাৎ কে যেন আমাকে ধাক্কা মারলো দেখলাম আমার "বড় জা" বলছে রাবেয়া রোমান মারা গেছে,শুধু একটা চিৎকার দিয়েছিলাম তারপরের ঘটনা আমার অজানা। 
 
রোমান কে নিয়ে যাচ্ছে অনেক আকুতি মিনতি করার পরেও কেউ শেষবারের মতো রোমানের মুখটা আমাকে একবার দেখতে দিল না কারণ তার চেহারাটা নাকি খুবই বীভৎস অবস্থা হয়েছিল।
আমি গর্ভবতী তাই এই অবস্থায় তার মুখটা দেখা আমার জন্য ঠিক হবে না।
 
হঠাৎ মনে পড়ে গেল চাচি শাশুড়ির সেই অভিশাপের কথা। সম্পর্কে আমার চাচি শাশুড়ি হলেও তিনি রোমানের শাশুড়ি। অর্থাৎ রোমান প্রথমে চাচাতো বোনকে বিয়ে করেছিল।
আমি হলাম রোমানের দ্বিতীয় স্ত্রী। 
 
চাচাতো বোন রাজিয়াকে রোমান ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সাত বছর সংসার করেছিল তারা। তাদের ঘরে দুইটি মেয়ে সন্তান আছে। কিন্তু দিনে দিনে রোমানের আচরণ বদলাতে থাকে। বাইরে থেকে নেশা করে এসে কারণে অকারনে রাজিয়াকে মারধর করতো। 
 
পাশাপাশি ঘর হ‌ওয়ায় রাজিয়ার মা-বাবা ও ভাইয়েরা বোনের অত্যাচারের প্রতিবাদ করতো কিন্তু রোমান কাউকেই ছাড় দিতো না শাশুড়ি কেও মারতো সে। অবশেষে রাজিয়া বাধ্য হয় রোমানের ঘর ছাড়তে , ডিভোর্স হয়ে যায় তাদের।
মেয়ে দুইজন মায়ের কাছেই থাকে।
 
আমি খুব গরিব ঘরের মেয়ে,অভাবের সংসার আমাদের দিন এনে দিন খায় এমন অবস্থা৷ কিন্তু রোমান রা প্রভাবশালী পরিবার টাকা পয়সা ধন দৌলতের অভাব নেই। বৈধ অবৈধ সব ভাবেই টাকা ইনকামের রাস্তা আছে তাদের।
 
তাই রোমানদের মতো এতো বড় পরিবার থেকে যখন আমার বিয়ের প্রস্তাব আসে, বাবা সাথে সাথেই রাজি হয়ে যায়। এতো বড় ঘরে আমি বউ হয়ে আসা তো ভাগ্যের ব্যাপার। তারপর দামি শাড়ি গয়না দিয়ে রোমানের দ্বিতীয় বউ করে ঘরে তোলে আমাকে। 
 
কয়েক মাসের মধ্যেই পুরান বাড়ি থেকে একটু দূরে নতুন বাড়ি বানায় রোমান। তারপর আমরা নতুন বাড়িতেই থাকতে শুরু করি। সবকিছু আমার নিজের হাতে সামলাতে হয়, মনে হয় আমি যেন এই সংসারের রানী। 
 
রাজিয়ার মেয়ে দুটো প্রায়‌ই আসে আসলে আমি আদর করি।
রোমান ও মেয়েদের অনেক আদর করে। না চাইতেই অনেক কিছু দেয় তাদের। এতে অবশ্য আমার ভালোই লাগে কারণ আমি যতদূর জেনেছি রাজিয়ার প্রতি কতোটা অমানবিক অন্যায় করেছে রোমান। মেয়েদেরকে কাছে টেনে অন্তত কিছুটা পাপমুক্ত হোক।
 
এদিকে রাজিয়া কে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবার অনেক চেষ্টা চালাচ্ছে কিন্তু কোন ভাবেই রাজিয়া কে বিয়ের জন্য রাজী করাতে পারছেনা। রাজিয়ার মা আমার চাচী শাশুড়ি অনেক কান্নাকাটি করতো, আর বলতো অমানুষ টা
 
আমার মেয়ের জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে। ওর যেন রাস্তাঘাটে মরণ হয়, ওর মুখটা যেন বিভৎস্য হয়ে যায়,কেউ যেন ওকে চিনতে না পারে।
এরকম অনেক কিছু বলে রোমান কে অভিশাপ দিত।
 
আমি প্রতিবেশীদের কাছে থেকে অনেক কিছু জেনেছি কি কি কারনে রাজিয়ার উপর অত্যাচার করতো রোমান, তাই সেসব কারণগুলো আমি এড়িয়ে চলতাম। গন্ডগোল করার কোন সুযোগ দিতাম না আমি। আমি আমার মতো থাকার চেষ্টা করতাম তার কোন বিষয়ে জানার আগ্রহ দেখাতাম না। 
 
কিন্তু বিপত্তি ঘটলো সেইদিন থেকে যেদিন আমি প্রেগনেন্সির কথা রোমান কে জানালাম। কথাটা শুনে রোমান প্রচন্ড রেগে গিয়ে বললো, বছর না ঘুরতেই বাচ্চা নেওয়ার কি দরকার আছে? এখন এনজয় করার সময় বাচ্চা তো পরেও নেওয়া যাবে, সময় তো ফুরিয়ে যাচ্ছে না! আচ্ছা ঠিকআছে যা হবার হয়েছে চিন্তার কিছু নেই, ডাক্তারের কাছে নিয়ে এব্রেশন করিয়ে আনবো।
 
বললাম কি বলছেন এসব আপনি? এটা আমার প্রথম বাচ্চা এই বাচ্চা আমি কিছুতেই নষ্ট করতে পারবো না।
আর সেইদিন-ই আমি প্রথম রোমানের হাতে নির্যাতিত হই।
কেন আমি ডাক্তারের কাছে যাব না এজন্য অনেক মেরেছে রোমান আমাকে।
তারপরে আমি আমার শাশুড়িকে ঘটনাটি জানাই।
শাশুড়ি শুনে রোমানের উপরে খুব রাগ হয়। তারপর একদিন বড় ভাসুর এসে রোমান কে শাসিয়ে গেল।
বুঝতে পারলাম শাশুড়ি নিশ্চয় ভাসুর কে কিছু বলেছে। 
 
সবাই বিষয়টা জেনে গেছে সেই কারনে রোমান গর্ভ অবস্থায়‌ও আমাকে অনেক শাস্তি দিতো,বলতো তুই প্রেগনেন্ট হয়েছিস তাহলে আমার শারীরিক চাহিদা মেটাবে কে?
আর তোর যখন এতই বাচ্চা নেওয়ার ইচ্ছে তোকে প্রতি বছরে এক পিচ করে বাচ্চা উপহার দেব, দেখব তুই কতো পারিস।
 
আমি রোমানের কথায় অবাক হতাম! বিশ্বাস হয়না একটা মানুষ এতটা জঘন্য কি করে হয়!? শুধু মনে হতো এই মানুষটার সাথে আমি বাকি জীবন কাটাবো কিভাবে? কাউকে কিছু বলতাম না লুকিয়ে লুকিয়ে কাদতাম। তারপর নিজেই নিজের মনের সাহস যোগাতাম,যে রোমান যদি আমাকে ভালো নাও বাসে তবুও আমার এখানে থাকতে হবে। কারন আমার যাবার কোন জায়গা নেই। আমাকে সহ্য করতে হবে আমার অনাগত সন্তানের জন্য। 
 
গরিবের মেয়ে তিনবেলা খেতে পাচ্ছি, ছাদের নিচে বসবাস করতে পারছি এটাই তো অনেক।
অবশেষে আমার সন্তান পৃথিবীর মুখ দেখলো। একটি ছেলে সন্তান হলো আমার। ছেলে হ‌ওয়ায় রোমান সম্ভবত খুশি হয়।
 
বাচ্চা কান্না করলে মাঝে মাঝে কোলে নেয়, হেঁটে বেড়ায়। এভাবেই দিন কাটছিল। কিন্তু রাতের বেলায় সেই একই চিত্র।ছাইপাশ গিলে নিশিরাতে ঘরে আসে । আর দরজা খুলতে একটু দেরি হলেই চড় থাপ্পরের অভাব নাই। তারপরও মানুষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তো। যা সহ্য করা আমার জন্য খুবই কষ্টকর ছিল। কিন্তু কি আর করার? হাজার মিনতি করলেও কোন কথা শুনতো না কারণ সেতো মানুষ ছিলনা অমানুষ হয়ে যেত।
 
ধীরে ধীরে শারীরিক কষ্ট একটা সময় অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।
যে সম্পর্কে প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই, শ্রদ্ধাবোধ নেই, সেখানে মনের কষ্টের স্থান মানে বাড়তি চাওয়া।
যেটা আমার জন্য প্রযোজ্য নয়।
 
ছেলেটার বয়স দেড় বছর। আমি আবারো অন্তঃসত্তা!
মানুষটাকে ঘৃনা করতে ইচ্ছে করতো কিন্তু সে-তো আমার সন্তানের বাবা তাকে কি করে ঘৃণা করব?
তবে মানুষটার এভাবে মৃত্যু হোক এটা কখনো চাইনি আমি। শত অবিচার করলেও ছায়া হয়ে পাশে তো থাকতো।
 
ঠিক তখনই মনে হলো,
অভিশপ্ত জীবন যার,
সেখানে আমার চাওয়াতে কি আর আসে যায়?
 
সমাপ্ত।

Next Post Previous Post