গল্পঃ স্বপ্ন বিভ্রাট | Story : Sopno Bivrat | লেখাঃ Nayeem Nahmed | Dream Break

গল্পঃ স্বপ্ন বিভ্রাট।
লেখাঃ Nayeem Nahmed

আমার স্বামী বাসায় নেই মাস তিনেক হলো!
উনি যাবার সময় আমার কাছে এসে নাকের সাথে নাক মিলিয়ে বলেছিলো, প্রতি মাসে অন্তত একটা হলেও চিঠি লেখবো। আমি তার চিঠির অপেক্ষায় রইলাম!
.
বাড়ির উঠোনের মাঝখানটায় একটা পিওন এসে দাড়ালো। হাতে চিঠির খাম!
নারুভা, পাশের ঘর থেকে দৌঁড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বল্ল, মা শোনো... বাবার চিঠি এসেছে!
আমি আঁতকে উঠলাম। চুলোয় রান্না রেখে, শাড়ীর আঁচল ঠোঁটে কামড়ে ধরে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালাম!
-- আমার শাশুড়ী পিওনের দিকে আসতে আসতে বল্লেন, কি... আমার খোকার চিডি আইছে?
-- পিওন শুকনো হাসি দিয়ে বল্ল, জ্বি খালাম্মা।
.
-- নারুভা আমায় জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, মা তুমি কাদছো কেন? বাবার চিঠি আসছে তুমি খুশি হওনি?
-- আমি নারুভাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বল্লাম, চোখে ধোঁয়া লেগেছে রে মা। একটু পর চোখের জ্বল এমনিতেই শুকিয়ে যাবে।
.
-- উঠোন থেকে আমার শাশুড়ী চোখ রাঙিয়ে বল্লেন, এখানে খারাইয়া কি দেহ? চুলায় কি যেন পুরার গন্ধ পাইতাছি?
-- আমি চোখে পানি নিয়েই এক ফালি হাসলাম, কতদিন পর আমার শাশুড়ী আমায় তুমি করে বল্ল! কি সুখ, কি সুখ!
.
আচ্ছা, নারুভার বাবা চিঠিতে কি লিখছে?
হয়তো এমন লিখেছে, রুপা... তুমি পেট ভরে খাও তো? রাতে তোমার ঠিকঠাক ঘুম হয়? ঘুমের মধ্যে কি আমি স্বপ্নে আসি? আলতো করে কি তোমার শাড়ীর আঁচল সরিয়ে চুল সরিয়ে দেই?
আহ্... আর ভাবতে পারছিনা। কি লজ্জা, কি লজ্জা!
-- নারুভা হঠাৎ এসে বল্ল, একি মা তোমার হাতে দেখি ফোসকা পরলো!
-- আমি, আমার মেয়েকে কিছু বলতে পারলাম না।
-- আমার শাশুড়ী পিছন থেকে এসে বল্ল, কিরে হারামজাদি পাতিলের ভাত পরছে কেমনে?
-- আমি কাপা কাপা গলায় বল্লাম, মার ফেলতে গিয়ে হাত ফসকে পরে গেছে।
-- আমার চুলের মুষ্টি ধরে শাশুড়ী বলতে লাগলো, কপাল পুড়া মাইয়া। ভাত তো ফালাইছেই আবার পাতিলটাও ভাংছে।
.
আমি চুপ চাপ দাড়িয়ে চুলের টান সহ্য করছি, এইতো আমার গালে একটা থাপ্পড় ও বসে গেলো। তারপর গরম খুন্তি চেপে ধরলো পিঠে।
.
একটা নতুন খেলা শুরু হলো!
আমার শাশুড়ী মেরে যাচ্ছে, আমি সহ্য করে যাচ্ছি। মারতে মারতে ওনি যদি ক্লান্ত হয়, এই খেলায় আমি জিতে যাবো। যদি আমি অজ্ঞান হই, আমার শাশুড়ী জিতে যাবে।
আমাদের এই খেলা প্রায়ই হয়। কখনো আমি জিতি কখনো জিতেন শাশুড়ী।
আজকে যেই জিতুক আমি খুশিই থাকবো। নারুভার বাবা আজ চিঠি পাঠিয়েছে। ওনার হাত দিয়ে লেখা চিঠিটা গভীর রাতে বুকে জড়িয়ে কাঁদবো। আমার সব "হার" চোখের জ্বলে ভাসিয়ে দিবো। আহ্... কি সুখ, কি সুখ!
সুখের এক পর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
.
দু'ঘন্টা পর সন্ধা। সন্ধার আজানের শব্দে আমার হুস ফিরলো।
নারুভা আমার পায়ের কাছে বসে আছে। আমি নারুভাকে বুকে জড়িয়ে কপালে চুমু আঁকলাম। মেয়েটা কেদে কেমন চোখ ফুলিয়ে রাখলো।
-- নিরবতা ভেঙ্গে নারুভা বিরবির করে বল্ল, জানো মা, বাবা নাকি তোমায় চিঠি লেখেনি!
আমার বুকে ঝড় শুরু হলো। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। নির্বিকার এই আমি টা কে নিজের কাছে জীবন্ত মমীর মত মনে হচ্ছে। মনে মনে ভাবলাম, আমি দিন দিন হেরেই যাচ্ছি।
আমার মেয়ে আমায় শক্ত করে ধরে বল্ল, মা তুমি হারোনি। আমি তোমায় ভালোবাসি, মা।
.
.
৩ বছর পর,
নারুভার বাবা আজ বাড়ি আসবে, আজ থেকে আমার কোনো দুঃখ থাকবেনা। ছোট দুঃখ, বড় দুঃখ, সব দুঃখ মাটিতে পিষে ফেলবো। দুঃখ মাটিতে পিষলে মনের উর্বরতা বাড়ে, আর সুখ পিষলে মনে একটা বটবৃক্ষ তৈরি হয়, যার নাম "সুখবট"!
এই তিন বছরে নারুভার বাবা মোট ৩৭টা চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু আমার জন্য একটাও না। পুরুষ মানুষ বড় পাষাণ!
চিঠি না পাঠাক,তাতে কি? হয়তো, হাতে অনেক কাজ ছিলো।
সমস্যা নেই, আজ তিনি আসবেন। এই সুখেই আমার মনে প্রকান্ড সুখবট তৈরি হয়েছে। আমি এখন হাসবো। কিন্তু আমার চোখে জ্বল কেন!
.
বিকেলের ট্রেনে নারুভার বাবা আসবেন। নারুভার মাঝে এই নিয়ে কত্ত আনন্দ!
বাড়িতে আয়োজন শুরু হলো... শরবত বানানো হলো, উঠোনে চেয়ার দেয়া হলো, গোসলের পানি তোলা হলো, ভালো হাতপাখা রেডি করা হলো, হারিকেনে তেল ভর্তি করা হলো।
আমার ছোট্ট মেয়েটা আজ সব কাজ যেন দৌঁড়ে দৌঁড়ে করছে।
আমি সুন্দর একটা শাড়ী বের করলাম। এ-শাড়ীটাও কয়েক জায়গায় ছিড়ে গেছে। মনে মনে বল্লাম, ছিড়ে গেছে তাতে কি? ছেড়া যায়গা টুকু ভিতরে রেখে পরলেই হয়।
আমি, শাড়ী টা পড়ে নিলাম। চোখে আই ব্রু আঁকালাম। ঠোঁটে লিপস্টিক আঁকতে আঁকতে ভাবলাম, পিঠে খুন্তি দিয়ে পুড়ে যাওয়া দাগটা তার চোখে পরবে তো? যদি পরে আমি বোধহয় লজ্জায় লাল হয়ে যাবো।
.
বাহির থেকে নারুভা বলে উঠলো, মা ও মা... বাবা আসছে বাবা।
আমার বুক, ধুঁক করে উঠলো। আয়নায় তাকিয়ে লজ্জায় চোখবুঁজে ফেল্লাম। এই চোখ কিভাবে খুলবো আমার জানা নেই। চোখ মিটমিট করে ঘরের দরজা ধরে দাড়ালাম।
.
নারুভার বাবা বাড়ি আসলো, আহ্... মানুষটা কে কত ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আমি ভালো করে চোখ খুল্লাম।
চোখ খোলে মনে হলো, আমি কেমন ঘাবড়ে গেলাম!
নারুভাকে উনি কোলে নেয়নি! এমন কি হাতটাও ধরলো না আমার মেয়ের! কিন্তু, ওনার সাথে সুন্দর মহিলা টা কে! তাও কেমন অসভ্যের মত হাত ধরে আছে!
টের পেলাম, আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে।
-- আমার শাশুড়ী এগিয়ে গিয়ে বল্ল, এটাই কি আমার লাল টুকটুকে নতুন বউ?
-- মেয়েটা, ক্লান্ত মুখে এক ফালি হেসে মাথা নিচু করলো। ইসস... কি লজ্জা, কি লজ্জা! লজ্জাতেই তো নারীর সুখ,নারীর সৌন্দর্য।
.
-- শাশুড়ী আমার দিকে কাজের মেয়ের মত তাকিয়ে বল্লেন, এই মেয়ে দরজায় খারাইয়া দেখচো কি? তাদের বাতাস করো।
আমার চোখের জ্বল শুকিয়ে গেলো। প্রকৃতির পরিবর্তনে সাগর শুকিয়ে যে মরুভূমি হয় এ আর নতুন কি?
.
-- নারুভার বাবা আমায় বল্ল, তুমি তো অনেক রোগা হয়ে গেছো। পাশের মেয়েটা মুচকি হাসলো।
-- আমি নিরব দাড়িয়ে হাতপাখা নাড়িয়েই যাচ্ছি। সাথে আমিও একটু হাসলাম। কি আজিব,এই হাসিতে আমার সুখবটের ডালপালা ভেংগে যাচ্ছে কেন? মনে মনে বল্লাম... কি সুখ, কি সুখ!
.
রাতে আমার ঘর ছেড়ে দিতে হলো। আমি এসে শাশুড়ীর ঘরের মেজেতে বিছানা পাতলাম। রাতের সাথে পাল্ল দিয়ে চোখের জোয়ার বাড়লো। জোয়ারের স্রোতে আমার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। আমি অতল ঘুমে তলিয়ে যেতে লাগলাম।
আবারো আমার গভীর স্বপ্নে টের পেলাম, নারুভার বাবা এসে শুইলো আমার পাশে! আমার পিঠ থেকে শাড়ী সরাল, ব্লাউজের দু'টো বুতাম খুলে খুন্তি দিয়ে পুড়ানো দাগে ঠোঁট ছোঁয়াল! আমি কেপে উঠলাম।
তার একটা হাত আমার পেটে ঝাপটে ধরলো! আমার চোখ দিয়ে টপটপ পানি পরছে!
আমি খুব করে চাইলাম এই স্বপ্নটা না ভাঙ্গুক!
.
.
রাত, তিনটে...
.
নাঈম (নারুভার বাবা)...
আমি টের পেলাম, রুপার চোখের জ্বলে আমার বুক ভিজে একাকার।
-- আমি চোখবুঁজেই ডাক দিলাম, রুপা... এই রুপা? তুমি কাঁদছো কেন?
-- রুপা শোয়া থেকে উঠে বসে গেলো। ডিম লাইটের আলোয় আমার দিকে প্রখর চোখে তাকিয়ে বল্ল, মেয়েটা কই?
-- আমি ব্রু কুঁচকে বল্লাম, রাত তিনটের সময় কিসের মেয়ে? কি স্বপ্ন দেখে কি বলছো?
-- রুপা আমার চোখমুখে খামচে ধরে বল্ল, এখন মনে নেই, না? গত তিন বছরে আমায় একটা চিঠিও দেও নাই! এতো দিন পর বাসায় আসছো কিন্তু আমার মেয়েকে তুমি কোলে পর্যন্ত নেওনি, অথচ বিয়ে করে একটা লাল টুকটুক মেয়ের হাত ধরে বাসায় ঢুকছো! আমায় দিয়ে বাতাস পর্যন্ত করালে! আর এখন বলছো কিসের মেয়ে!
-- আমি হা হয়ে বল্লাম, দু-মাস হলো বিয়ে হলো। কোন রাত তোমায় ছাড়া থাকিনি। আর তুমি এসব কি বলছ?
বিশ্বাস করো, যা হবার স্বপ্নে হয়েছে বাস্তবে কিচ্ছু না।
.
-- রুপা আরো কঠিন হয়ে আমার দিকে তাকালো!
-- আমি বুঝতে পারলাম, আমি এখন বড় রকমের আসামি! আমার দোষ, স্বপ্নে কেন অন্য মেয়েকে বিয়ে করলাম!
.
চার দিকে নিঝুম রাত, সিলিং ফ্যানের হু হু শব্দ।
রুপা ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে।
আমি একা খাটের এক কোণে গৃহপালিত স্বামীর মত বসে আছি। এখন, আমার শোয়া একদম নিষেধ!
 
------------ সমাপ্তি ------
========== 00 ============= 00 =============== 00 =============== 
২০০৬ সালের ঘটনা ‌। তখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র আমি। সরকারি বিএম কলেজ, বরিশাল এর সমাজবিজ্ঞান এর ছাত্র। কলেজ এরিয়ার বাহিরে বরিশালের জাইল্লা বাড়ির পোল সংলগ্ন একটা ভাঙাচোরা ছাত্রাবাস আছে। সুরেন্দ্র ভবন ছাত্রাবাস। অনেকেই হয়তো জানে না এটা বিএম কলেজের ছাত্রাবাস। জানবেই বা কিভাবে? বাহির থেকে দেখলে মনে হয় একটা ভাঙাচোরা ভুতুড়ে বাড়ি। ছাত্রাবাসটি টিনের তৈরি। পেছনে অবশ্য একটি পরিত্যক্ত ভাঙাচোরা জমিদার বাড়ি আছে। আমি থাকতাম একদম পশ্চিম পাশের ১০১ নম্বর রুমে।
প্রথম যেদিন ছাত্রাবাসে উঠি সেদিন আমাদের ছাত্রাবাসের কেয়ারটেকার সুভাষ দা বলেছিলেন, দাদাভাই পেছনের ওই ভাঙ্গা জমিদার বাড়ির দিকে সন্ধ্যার পরে ভুল করেও কখনো যাবেন না ।
 
আমি কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন দাদা?
সুভাষ দা বললেন, নিষেধ করেছি, যাবেন না। আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না দাদাভাই।
আমি হুঁম.. বলে সম্মতি সূচক মাথা নাড়লাম।
তারপর কেটে গেল বেশ কয়েক মাস। সুভাষ দা'র নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী সন্ধ্যার পরে জমিদার বাড়িটার দিকে যেতাম না। সন্ধ্যার পরে যাবোই বা কিভাবে? দিনের বেলায়ই তো ওটার কাছে গেলে গা ছমছম করতো।
১৬ নভেম্বর, ২০০৬ । রাত ১:২০ ।
 
পড়া শেষ করে চেয়ার থেকে উঠলাম। সামনে অনার্স প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা। তাই পড়া শেষ করতে একটু রাত হল। রাত জেগে পড়ছি বলে আমাকে এত ভালো ছাত্র ভাবার কোনো দরকার নেই। আসলে আমার মত ফাঁকিবাজ ছাত্ররা সারা বছর বই পুস্তক সেলফেই রেখে দেয়। পরীক্ষার আগে যখন বই বের করে তখনও বই থেকে নতুন বইয়ের গন্ধটাও পাওয়া যায় । শেষ সময়ে এসে পড়ার চাপে চোখে মুখে সরষে ফুল দেখে।
 
যাইহোক প্রতিদিনের মতো মাঝ রাতে হাতে ব্রাশ নিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে করতে ছাত্রাবাসের সামনের রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তাটি হাসপাতাল রোড এবং কাউনিয়া প্রধান সড়কের সংযোগ সড়ক। এই রাস্তায় খালের ওপরে যে পুলটি আছে সেটাই জাইল্লি বাড়ির পোল নামে পরিচিত। পুলটি রাস্তা থেকে অনেকটা উঁচু। রাস্তা থেকে পুলের উপরে ভালোভাবে দেখা যায় না।
 
গভীর রাত হওয়ায় রাস্তাটি একদম জনমানুষ শূন্য। অন্যান্য দিন রাস্তায় কয়েকটা কুকুর দেখলেও আজকে ওদেরকে দেখছি না। সেদিন যেন হঠাৎ করেই কুয়াশা পড়া শুরু হয়েছিল। হালকা শীত লাগছে। প্রতিদিনের মতোই রাতের সৌন্দর্যটাকে উপভোগ করতে করতে আপন মনে হাটাহাটি করছি। হঠাৎ পুলের ওপরে একটা বাচ্চা ছেলে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম । আমি ভাবলাম এত রাতে পুলের উপরে কার বাচ্চা কান্না করে ? পরে ভাবলাম হয়তো সিটি কর্পোরেশনের কোন পরিছন্নতা কর্মীর বাচ্চা হবে। কারণ ওরা তো রাতের বেলায় কাজ করে। নিচ থেকে পুলের ওপরে দেখা যাচ্ছিল না। তারপর আবার কুয়াশা পড়েছে। কৌতুহল নিয়ে আমি হেঁটে পুলের দিকে যাচ্ছিলাম। পুলের কাছে যেতেই হঠাৎ করেই বাচ্চাটার কান্না শব্দ অনেক বেড়ে গেল। আমার শরীরটা ভারী হয়ে উঠল। বেশ ভয় পেলাম। তাড়াতাড়ি পা বাড়িয়ে ছাত্রাবাসের গেটের ভেতরে ঢুকলাম। তখন শুনতে পেলাম একটা নারী কন্ঠ।
মেয়েটি বলছে, এই! এখানে বসে কাঁদছিস কেন? চল.. ওঠ..
 
মেয়েটির কথা শুনে মনে মনে নিশ্চিত হলাম, হ্যাঁ কোন পরিছন্নতাকর্মীই হবে। তারপর আমি আবার বের হয়ে পুলের ওপরে আসলাম। কিন্তু কই সেখানে কাউকে দেখতে পেলাম না। হালকা কুয়াশা ভেদ করে সামনের দিকে তাকাতেই দেখলাম লাল রং এর শাড়ি পরা একটা রমণীর হাত ধরে দুই তিন বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে হেঁটে কাউনিয়া প্রধান সড়কের দিকে যাচ্ছে। ওদের হাটার ভঙ্গিটা ছিল অদ্ভুত। খুবই ধীর স্থির। রাস্তার মাথায় গিয়ে মোড় নিয়ে ডান দিকে চলে গেলো ওরা দুৎ। ঠিক তখনই আমার শরীরটা ভার হয়ে আসলো। থর থর করে কাঁপতে শুরু করলাম। মনে সাহস রাখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারছি না। এক দৌড়ে রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। ‌ খুব শীত লাগছিল। কম্বলটা জড়িয়ে নিলাম । সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
 
হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যে সেই নারীর কণ্ঠ শুনতে পেলাম। মুন্না.. এই মুন্না....
মনে হল স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু না। শান্ত কন্ঠে ক্রমাগত ডেকেই চলেছে..
মুন্না.. এই মুন্না.. মুন্না শুনছো....
(শরীরে একটা হালকা ধাক্কার অনুভূতি পেলাম)
চোখ মেলে দেখি বাহিরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই লাল শাড়ি পরা মেয়েটি। বয়স ১৬/১৭ হবে। অনিন্দ্য সুন্দরী বলতে যেটা বোঝায় ঠিক সেটাই! মুখটায় এত মায়াভরা! সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ে যাবার মতই অবস্থা। আমি বিমোহিত হয়ে গেলাম।
 
মেয়েটি বলল, বাহিরে এসো মুন্না। কথা আছে।
আমার মাথায় কিছুই কাজ করছিল না। মেয়েটির কথামতো কম্বল ছেড়ে আস্তে করে বাহিরে বের হয়ে এলাম। আসার সময় দেখলাম রুমমেটরা সবাই ঘুমাচ্ছে। রুমের দরজাটা বাইরে থেকে লক করে দিলাম। রুমের পেছনে আমার বেডের পাশে যে জানালাটা আছে সেখানে গেলাম। মেয়েটি আমার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল জমিদার বাড়ির দিকে। আমিও ওর দিকে বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কি?
মেয়েটি বলল, অবন্তিকা।
চলবে....
 
#অবন্তিকা পর্ব-১
✍️ Jamal Hossain Munna
=========== 00 ========== 00 =============== 00 ========== 
মাওলানা তারিক জামিলের মুখে শোনা ঘটনাটি।
 
আমি পৃথিবীর অনেক গুলো রাষ্ট্রের মধ্যে, কয়েকটি রাষ্ট্র সফর করেছি, এর মধ্যে জর্ডান সফরের একটা অংশ তুলে ধরছি।
 
আমি আর আমার স্ত্রী যখন জর্ডানে পৌঁছে গেলাম, তখন তাবলীগ জামাতের আমীর সাহেব, আমাদেরকে তাদের বাসায় নিয়ে গেলেন।
আমরা দুজনেই ভীষণ অবাক হলাম, মাত্র দু কক্ষ বিশিষ্ট একটা ঘর, ঘরের মধ্যে এক পাশে কিছু থালা বাসন, তরকারির ঝুড়ি, একটা কাঠের উপর জড়ো করা কয়েকটি কাপড়, আর আরাম করার জন্য একটা মাদুর, ও দুই খানা ইট।
 
আমার স্ত্রীকে নিয়ে এক কক্ষে আর আমাকে আরেক কক্ষে নিয়ে গেলেন। উনার মোট ছয়টি মেয়ে, যারা সবাই পরিপূর্ণ পর্দা করে, আর একটা খুব ছোট ছেলে বাচ্চা কোলে।
ছেলেটির বয়স যখন একদিন, তখনই তার মা, কালো একটা কাপড় দিয়ে বাচ্চার চোখ বেঁধে দুধ পান করায়। এখন ওর বয়স এক বছর, ওর যখন দুধ খাওয়ার নেশা চাপে, তখনই কালো কাপড় টা মায়ের হাতে তুলে দেয়। বোনদের সাথে কিতাবের উপর হাত দিয়ে পড়ার চেষ্টা
করে।
 
আমার স্ত্রীকে খাবার দেওয়ার পর, তিনি এইসব দৃশ্য দেখে দোয়া না পড়েই খাবার মুখে দিতে গেলেন। ৪ বছরের পিচ্চি মেয়ে, আমার স্ত্রীর হাত চেপে ধরলেন, আর বললেন দোয়া না পড়লে খাবার খেতে দেবোনা। এইসব দৃশ্য আমি খুব উপভোগ করছিলাম আর জুতা পায়ে দিচ্ছিলাম, পিচ্চি টা দৌঁড়ে এসে বললো, চাচা আপনি তো বাম পায়ের জুতা আগে পায়ে দিছেন, এখন খুলে আবার ভাল করে দোয়া পড়ে জুতা
পায়ে দিন।
 
আমি চিন্তায় বিভোর হয়ে গেলাম, এটা কেমন মা, যার ৪ বছরের মেয়ে, আমার মতো মাওলানার ভুল ধরিয়ে দেয়!
আমি আমির সাহেবের সাথে রাস্তায় বের হয়ে একটা গাড়িতে উঠলাম।
তারপরেই ঘটলো একটি ভয়াবহ ঘটনা,
ড্রাইভার মাতাল থাকার কারনে হঠাৎ এ্যাকসিডেন্ট করে গাড়িটি। এবং আমার চোখের সামনেই আমির সাহেব ইন্তেকাল করেন।
 
সবাই মিলে ধরাধরি করে লাশটা নিয়ে এলাম, উনার স্ত্রী, কন্যা লাশ দেখে দোয়া পড়লেন, যেখানে আমারই ইচ্ছা করছে চিৎকার করে কান্না করতে, সেখানে
উনার পরিবারের কারোরই কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম না।
আমার স্ত্রী এসে হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ভাবী ভাইয়ের দাফনের ব্যবস্থা করতে বলেছে দ্রুত!
 
আমি সবকিছু এনে দেখি, আমার স্ত্রী একা একা কান্না করছে, আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে ভীষণ জোরে-জোরে কান্না শুরু করে দিলো, আমি তার মুখ চেপে ধরে
আওয়াজ বন্ধ করলাম, বললাম কি হয়েছে?
 
আমাকে বললো, ওগো আমাকে ক্ষমা করো, তোমার উপযুক্ত স্ত্রী আজও হতে পারিনি, ঐ দেখো, ভাইয়ের পরিবারের সবাই নামাজে দাঁড়িয়ে কান্না করছে, আল্লাহর কাছে তার মাগফেরাত কামনা করছে।
 
ওগো এতো ধৈর্যশীলা পরিবার ও কি এখনো আছে। আমি আমার স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বাহিরে এসে, লাশের বাকিটুকু কাজ সমাধান করলাম।
রাতের বেলায় হঠাৎই ঘুম ভেঙ্গে গেলো কান্নার শব্দে।
আস্তে-আস্তে উঠে গিয়ে দেখি, ভাবী সাহেবা তার ছয় মেয়েকে নিয়ে তাহাজ্জুদ সালাতে কান্না করছে।
 
কি অবাক করা বিষয় এই ৪ বছরের বাচ্চা মেয়েও মায়ের সাথে সমানে দোয়া করে যাচ্ছে, মনোযোগ দিয়ে দোয়া করা শুনতে লাগলাম।
এতো দারুণ দোয়া যে, শুনতে শুনতে কখন যে, আমার চোখের পানি দাড়ি ভিজে মাটিতে পড়ছিল, তা নিজেও
জানিনা।
 
আল্লাহর কাছে বললেন, তার বিয়ের উপযুক্ত মেয়েকে যেন আল্লাহ দ্রুতই কোন ব্যবস্থা করে দেন ,,,, আর ও বললেন, ইয়া আল্লাহ আমাদেরকে উত্তম রিযিক দান করো।
আমি ফজরের সালাতের পরে একটু ঘুমিয়ে পড়লাম, ঘুম থেকে উঠে শুনি, শহরের নাম করা তিন জন হুজুর প্রচুর পরিমাণে মোহরানা নিয়ে, তার তিন মেয়েকে
বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, উনি রাজি হওয়ায়, দুপুরে বিয়ে।
আমার খুব কান্না চলে আসলো, উনি কেমন রমনী, যে কিনা রাতের বেলায় দোয়া করতেই ভোর বেলায় ফল পেয়ে যান!!
 
আল্লাহ তায়ালা এধরনের পরিবার আমাদেরকেও দান করুন।
আমিন।❤️
Next Post Previous Post